কলকাতার ওই দুর্ঘটনার দায় ‘আরসালান নয়, তার বড় ভাইয়ের’

কলকাতায় মধ্যরাতে গাড়িচাপায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় নামকরা রেস্তোরাঁ ‘আরসালান’র মালিকের ছোট ছেলেকে গ্রেপ্তারের চার দিন পর পুলিশ বলছে, আরসালান পারভেজ নয়, তার বড় ভাই রাঘিব পারভেজ এই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন।

ঘটনার পরদিন দুবাইয়ে পালিয়ে যাওয়া রাঘিবকে দেশে ফিরিয়ে এনে এরইমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বুধবার আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান মুরলীধর শর্মার বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, “দুর্ঘটনার রাতে ঘাতক জাগুয়ারের স্টিয়ারিং ছিল আরসালানের দাদা রাঘিব পারভেজের হাতে। বড় ছেলেকে বাঁচাতে আত্মসমর্পণ করানো হয় ছোট ছেলেকে।”

আরসালান পারভেজ

আরসালান পারভেজ গত শুক্রবার মধ্যরাতে কলকাতার লাউডন স্ট্রিটের কাছে গাড়িচাপায় মারা যান বাংলাদেশি নাগরিক কাজী মুহাম্মদ মঈনুল আলম (৩৬) ও ফারহানা ইসলাম তানিয়ার (২৮)। মঈনুল গ্রামীণফোনের রিটেইল সাপোর্ট ম্যানেজার এবং তানিয়া সিটি ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার সিনিয়র অফিসার ছিলেন।

কলকাতার সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, রাত ২টার দিকে একটি জাগুয়ার তীব্র গতিতে শেক্সপিয়র সরণি ধরে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের দিক থেকে কলামন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। লাউডন স্ট্রিটের কাছে সেটি একটি মার্সিডিজকে সজোরে ধাক্কা মেরে রাস্তার পাশে ট্রাফিক পুলিশের একটি পোস্টে ঢুকে পড়ে। মঈনুল, তার চাচাত ভাই মো. শফী রহমত উল্লাহ এবং তানিয়া তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ওই পুলিশ পোস্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গাড়িটি মঈনুল ও তানিয়াকে চাপা দেয়।

পরদিন এ ঘটনায় কলকাতার নামি রেস্তোরাঁ আরসালান-এর মালিক আখতার পারভেজের ছেলে আরসালানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়ে আসা আরসালান কলকাতার কেন্দ্রস্থলের পার্ক সার্কাস মোড়ের রেস্তোরাঁ ‘আরসালান’র মালিকানা পেয়েছেন পৈত্রিক সূত্রে।

আনন্দবাজার বলছে, “দাদাকে বাঁচাতেই দুর্ঘটনার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ভাই আরসালান।”

কালো রঙের এই গাড়িটিই বেপরোয়া গতিতে অপর একটি গাড়িতে ধাক্কা মেরে উঠে যায় ট্রাফিক পুলিশের বক্সে কলকাতার গোয়েন্দা প্রধান মুরলীধর শর্মা বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আরসালানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সন্দেহ দেখা দেয়। দুর্ঘটনার সময় গাড়ির এয়ারব্যাগ খুলে যাওয়ায় তাতে চালকের আঘাত পাওয়ার কথা।

“কিন্তু আরসালানের শরীরে কোনও রকম আঘাতের চিহ্ন মেলেনি। তাতে আরও সন্দেহ জাগে গোয়েন্দাদের।”

এরপরই দুর্ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করেন কলকাতার গোয়েন্দারা। খতিয়ে দেখা হয় আশপাশের দোকান এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রায় ৪৫টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। সৈয়দ আমির আলি অ্যাভেনিউয়ে আরসালানের বাড়ির সামনের সিসিটিভি ফুটেজও জোগাড় করা হয়। ওই ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার দিন রাত ১১টার কাছাকাছি সময়ে ওই বাড়ি থেকে এক যুবক বেরোচ্ছেন।

পারভেজের গাড়ির ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া এই গাড়ির আরোহীরাও আহত হয়েছেন বলে কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে এদিকে দুর্ঘটনা কবলিত জাগুয়ার গাড়িটির ইভেন্ট ডেটা রেকর্ডার (ইডিআর) থেকে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, অত্যাধুনিক ওই গাড়ি চালু করতে গেলে কিছু তথ্যের প্রয়োজন হয়। সে জন্য পারভেজ পরিবারের একাধিক সদস্যের মোবাইল নম্বর দেওয়া ছিল, যে নম্বর ছাড়া ওই গাড়ি চালু করা সম্ভব নয়।

সেখান থেকে বেরিয়ে আসে শেষবার গাড়িটি চালু করা হয়েছিল যে মোবাইল নম্বর দিয়ে, সেটি রাঘিব পারভেজের। ওই মোবাইল নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপের ছবি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয়, ওই রাতে আখতার পারভেজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা যুবক এবং শেকসপিয়র সরণি ধরে হেঁটে-দৌড়ে যাওয়া যুবকের একই ব্যক্তি।

এরপর পরিবারকে চাপ দিয়ে রাঘিবকে দেশে ফিরিয়ে এনে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটের দিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে আনন্দবাজার জানিয়েছে। রাঘিবকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহযোগিতাকারী তার এক মামাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রাঘিব দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন বলেও পুলিশ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আনন্দবাজার।

Leave a Response