বাংলানিউজমেইল
জাতীয়

দুই বছর পরও শহীদ পরিবারে হাহাকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

জুলাই অভ্যুত্থানের পেরিয়ে গেছে দুই বছরক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, সরকার বদলেছে, আদালতে মামলা হয়েছে, তদন্তও চলছে। কিন্তু আজও সেই দিনগুলোর ভেতর আটকে আছেন ফরিদা ইয়াছমিন কিংবা মোশারফ হোসেনএকজনের কানে এখনো ভাসে ছেলের শেষ আবদার— ‘মা, আমি আন্দোলনে যাই না।আরেকজন নিজেকে সান্ত্বনা দেন— ‘আমার ভাগ্য খুব ভালো, মেয়েটা আমার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছে।

দুই পরিবারের একজন হারিয়েছেন ছেলে মাহমুদুল হাসান রিজভীকে, অন্যজন মেয়ে মেহেরুন নেসা তানহাকে। একজন নিহত হন ১৮ জুলাই উত্তরার রাজপথে, অন্যজন ৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে। সময় ও ঘটনার ভিন্নতা থাকলেও দুই পরিবারের শোক, অপেক্ষা আর বিচার না পাওয়ার বেদনা যেন একই সুতোয় গাঁথা।

পরিবারের স্বপ্ন ছিল রিজভীকে ঘিরে: নোয়াখালীর একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম মাহমুদুল হাসান রিজভীর। বাবা জামাল উদ্দিন একটি এনজিওতে চাকরি করেন। মা ফরিদা ইয়াছমিন গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রিজভী ছিলেন সবার বড়। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু স্বপ্নের অভাব ছিল না। বাবা-মা বিশ্বাস করতেন, বড় ছেলে একদিন সংসারের হাল ধরবে।

লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের অষ্টম সেমিস্টার শেষ করে ইন্টার্নশিপের জন্য ঢাকায় আসেন রিজভী। যুক্ত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মহানগর সংসদের সঙ্গে। পরিকল্পনা ছিল, ইন্টার্নশিপ শেষে চাকরি করবেন, তারপর কাঁধে তুলে নেবেন পরিবারের দায়িত্ব। কিন্তু জুলাইয়ের আন্দোলন তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে উত্তরার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হন রিজভীও। তবে পরিবারের কাউকে জানাননি বিষয়টি।

আন্দোলনের দিনগুলোয় ছেলের সঙ্গে শেষ দিকের কথোপকথনের স্মৃতি তুলে ধরে মা ফরিদা ইয়াছমিন বলছিলেন, ‘আমি ফোন করে বলতাম, বাবা সাবধানে থাকিস। ও বলত, মা, আমি আন্দোলনে যাই না। পরে জানতে পারলাম, আমাদের অগোচরেই আন্দোলনে যেত।’ ১৮ জুলাই সকাল থেকেই উত্তরা পরিণত হয় আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রস্থলে। হাউজ বিল্ডিং থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়ক চলে যায় শিক্ষার্থীদের দখলে।

প্রত্যক্ষদর্শী শরিফুল আনোয়ার সজ্জন জানালেন, দুপুরের দিকে একটি সাঁজোয়া যানের নিচে এক শিক্ষার্থী চাপা পড়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় গুলিবর্ষণ। বিকালের দিকে আশপাশের উঁচু ভবন থেকেও ছোড়া হয় ছররা গুলি। বিকাল ৫টার দিকে শুরু হয় সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযান। সে সময়ই মাথায় গুলি লাগে রিজভীর।

‘রিজভীর সঙ্গে থাকা কয়েকজন আমাকে ফোন করে জানিয়েছে, ও গুলি খেয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ছররা গুলি। বলেছিলাম, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাও। কিন্তু ক্রিসেন্ট হাসপাতালে পৌঁছে জানতে পারি, গুলিটি সরাসরি মাথায় লেগেছে’— যোগ করলেন তিনি।

আইসিইউতে নেওয়ার পরও কিছু সময় প্রাণ ছিল রিজভীর শরীরে। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। কিন্তু রাত সাড়ে ৭টার দিকে পরিবারকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। রাত ১১টার কিছু পর লাইফ সাপোর্ট খুলে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় তার মৃত্যু।

নোয়াখালী থেকে ছেলের খবর পেয়ে ঢাকায় ছুটে আসেন বাবা-মা। পথে তাদের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। স্বজনরা চেয়েছিলেন, হাসপাতালে পৌঁছানো পর্যন্ত অন্তত আশাটুকু বেঁচে থাকুক। রাত ৩টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছে তারা দেখেন, তাদের পৃথিবী নিথর হয়ে শুয়ে আছে। যে অ্যাম্বুলেন্সে ছেলেকে দেখতে এসেছিলেন, সেই একই অ্যাম্বুলেন্সে ছেলের মরদেহ নিয়ে ফিরতে হয় বাড়ি।

দুই বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত: দুই বছর পার হলেও তদন্ত শেষ হয়নি রিজভী হত্যা মামলার। রিজভীর বাবা জামাল উদ্দিনের ভাষ্য, ‘আমি তদন্ত কর্মকর্তাকে স্পষ্ট করে বলেছি, নির্দোষ কাউকে যেন আসামি না করা হয়। আবার প্রকৃত অপরাধীও যেন বাদ না যায়। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, অপরাধ দেখে বিচার হোক। আজ দুই বছর হয়ে গেল। এখনো চার্জশিট দিল না। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি।’

‘জুলাইয়ের অনুষ্ঠান থাকলে আমাদের ডাক দেয়। কিন্তু এর বাইরে মামলার কী অবস্থা, কেউ জানায় না। আমরা নিজেরা গেলেও অনেক সময় কথা শুনতে চায় না’—প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আক্ষেপ করে বলছিলেন তিনি। কথা বলতে বলতে তিনি থেমে যান। এরপর ধীরে বিড়বিড় করছিলেন, ‘ও ছিল আমার সবার বড় ছেলে। অনেক নিষেধ করেছিলাম আন্দোলনে যেতে। শোনেনি। কপালে ছিল না… চলে গেল। ছেলে তো আর ফিরে আসবে না। বিচারও তো এখনো পেলাম না।’

বাবার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস তানহার: রিজভীদের মতোই আরেকটি পরিবার আজও বয়ে বেড়াচ্ছে শহীদ মেহেরুন নেসা তানহার স্মৃতি। তানহা ছিলেন হযরত শাহ আলী সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। বাবা বারবার নিষেধ করতেন। কিন্তু তানহা বলতেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে ঘরে বসে থাকা যায় না। আন্দোলনে তার মামাতো ভাই আকরাম খান নিহত হওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত হয় আরও দৃঢ়। তানহার বাবা মোশারফ হোসেন বলছিলেন, ‘ও বলত, ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই। আন্দোলন ছাড়ব না।’

তিনি ৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বললেন, ‘শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর শোনার পর সকালে তানহা গণভবনের দিকে যায়। আমি যেতে নিষেধ করেছিলাম। ওর কাছে ভাড়ার টাকাও ছিল না। আমি টাকা দিইনি। গাড়িও চলছিল না। তাই সে হেঁটেই চলে গিয়েছিল।’

স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন, ‘সন্ধ্যায় এলাকায় গুলির শব্দ শুরু হলে আমি তানহাকে ফোন করে বলি, মা, সাবধানে বাসায় চলে আসো। তানহা ফিরেও আসে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই গুলিবিদ্ধ হয়। আমি নিজেই কোলে তুলে নিচে নামাই। এরপর রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলাম। পথে একবার মুখ নড়েছিল। তখনই বুঝলাম, শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছে। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’ কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বললেন, ‘ভাগ্য খুব ভালো যে মেয়েটা আমার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছে। ও রাস্তায় পড়ে থাকেনি। কেউ ওর মরদেহ নিয়ে টানাটানি করেনি। আমরা সবাই ওর পাশে ছিলাম। এভাবেই সান্ত্বনা দিই নিজেকে।’

‘সন্তান আর ফিরবে না, বিচার অন্তত হোক’: মামলার অগ্রগতি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করলেন মোশারফ হোসেন। ‘মামলা করেছি। কিন্তু কী হচ্ছে, কাকে ধরা হচ্ছে, কাকে ছাড়া হচ্ছে— আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।’ শেষে একটাই প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তার ভাষ্য, ‘আমাদের সন্তান তো আর ফিরে আসবে না। আমরা শুধু চাই, যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হোক। আর এমন একটি বাংলাদেশ হোক, যেখানে আর কোনো বাবা-মাকে সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে বাঁচতে না হয়।’

 

 

Related posts

নারী উন্নয়নে নবজাগরণ ঘটেছে বাংলাদেশে : প্রধানমন্ত্রী

bangladmin

আমরা নিরপেক্ষ থাকতে চাই, আমাদেরকে সাহায্য করবেন: সিইসি

bangladmin

বিডিআর বিদ্রোহ ছিল দেশকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র: তদন্ত কমিশন প্রধান

bangladmin

বদলি ঠেকাতে ডেপুটি স্পিকারের জাল ডিও লেটার: সেই এসি-ল্যান্ডের নামে মামলা

bangladmin

সরকারের সামনে তিন চ্যালেঞ্জ: ওবায়দুল কাদের

bangladmin

বংশালে হেলমেটের গোডাউনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৭ ইউনিট

bangladmin

Leave a Comment