‘রিফাত হত্যার পরও নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির ৫ বার ফোনালাপ হয়’

ঢাকা: বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আগে ও পরে নয়ন বন্ডের সঙ্গে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সর্বমোট ১৩ বার ফোনালাপ হয়। এর মধ্যে রিফাতকে হত্যার পরও মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের সঙ্গে পাঁচ বার ফোনালাপ হয় বলে দাবি করে মিন্নির জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে মিন্নি একজন নারী ও বিধবা এবং তার বয়স কম— এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে মিন্নির জামিন প্রার্থনা করেছেন মিন্নির আইনজীবীরা। আদালত এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) রায় দেবেন বলে দিন ঠিক করে দেন।

২৮ আগস্ট বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে মিন্নির জামিন আবেদনের এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

আদালতে মিন্নির জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মশিউর রহমান, মাক্কিয়া ফাতেমা, জামিউল হক ফয়সাল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসেন বাপ্পী। এ সময় আদালতে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাবেক বিচারপতি মুনসুরুল হক চৌধুরী মিন্নির জামিনের পক্ষে তার মত তুলে ধরেন।

শুনানির শুরুতে মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না আদালতকে বলেন, কয়েকদিন ধরে এ মামলায় শুনানি করছি। আজ শুধু এ কথাই বলব, মিন্নিকে যেদিন গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করা হলো, সেদিন তার পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় তার কাছে আদালত জানতে চাইলে তিনি (মিন্নি) জানান, ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। পুলিশ এ মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। বিজ্ঞাপন

পরে রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভাইরাল হওয়া ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ভিডিও ফুটেজের ডিস্ক আদালতে দাখিল করেন।

তিনি আদালতকে বলেন, এইসব সিসি ক্যামেরা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও ভিডিওগুলো কিভাবে বাইরে প্রকাশ হলো? এটাও কিন্তু একটা অপরাধ।

মিন্নির আইনজীবী বলেন, মিন্নি বিধবা ও ১৯ বছর বয়সী একজন নারী। তাকে জামিন দিলে তিনি পালিয়ে যাবেন না। তাই আমরা তার জামিন প্রার্থনা করছি। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছি, কিন্তু আমরা এখনো তা হাতে পাইনি।

এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (ইনসপেক্টর) হুমায়ুন কবিরের কাছে মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চান আদালত। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তদন্তের প্রায় শেষ পর্যায়ে আছি। আজ বিচারিক আদালতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু আজ মহামান্য আদালত (হাইকোর্ট) থাকতে হয়েছে বিধায় প্রতিবেদন দাখিল করতে পারিনি।

আদালত বলেন, এ মামলায় কি নয়ন বন্ডকে গ্রেফতার করেছিলেন? জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আমি গত ৩০ মে বরগুনায় নিযুক্ত হই। এরপর অন্য মামলায় নয়ন বন্ডকে আসামি হিসেবে পাই। এ মামলায় সে গ্রেফতার হয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে খবর পেয়ে নয়নকে গ্রেফতার করতে গেলে বন্ধুকযুদ্ধে সে মারা যায়।

এরপর আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে পেছনে বসতে বলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে তার বক্তব্য উপস্থাপন করতে বলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতকে বলেন, নয়নের সঙ্গে মিন্নির সম্পর্ক ছিল— এটা তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের স্বীকার করেছেন। এই মামলাটি অনেক স্পর্শকাতর এবং জনমনে বেশ আগ্রহ কাজ করছে।

তখন আদালত জানতে চান, ঘটনার পর পুলিশ নয়নের বাড়ি গিয়ে বুঝতে পারল তাকে (মিন্নি) গ্রেফতার করা প্রয়োজন। কিন্তু তার আগে প্রেস ব্রিফিং করায় তার (মিন্নির) সঙ্গে কোনো মিল আছে?

মামলার প্রতিবেদন তুলে ধরে তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, কলেজের সামনে ওই ঘটনার আগে নয়নকে মিন্নি আট বার ফোন করে কথা বলেছিলেন। ঘটনার পরও পাঁচ বার নয়নকে ফোন করে কথা বলেন। কল লিস্টে তাই উঠে এসেছে। তাছাড়া ঘটনার পর রিফাতকে হাসাপাতালে পাঠানো হলেও মিন্নি কিন্তু যায়নি। এটা কি তাকে নিষ্পাপ প্রমাণ করে?

আদালত বলেন, এখানে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত আছেন। তারা ফোনের কথোপকথন তুলে দেখতে পারেন, কী কী কথা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তখন বলেন, তিনি (মিন্নি) এই ঘটনার মূল ষড়যন্ত্রকারী। তার বয়স ১৯ এবং তিনি নারী— এসব বলে জামিনের কোনো সুযোগ নেই। তাকে জামিন না দিয়ে মামলার ন্যায়বিচারে স্বার্থে তার জামিনের বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করা হোক।

এ সময় মিন্নির আইনজীবী বলেন, একটি মানুষের ফোনে প্রতিদিন অনেক কল আসতে পারে। একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য তুলে ধরে বলেন, পত্রিকায় তথ্য আছে এই ঘটনার আগে ৭৭ বার পুলিশের সঙ্গে নয়নের কথা হয়েছে। বরগুনা থানার এসআই আসাদুজ্জামানের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। আপনারা মিন্নিকে জামিন দিন, প্রয়োজনে আমি তার গ্যারান্টার থাকব।

তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, নয়ন তার একটি পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল আটকের বিষয়ে ওই এসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করত।

এ সময় আদালতে উপস্থিত থাকা আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে, মেয়েটির বয়সও ১৯ বছর। তার বিরুদ্ধে যেহেতু সরাসরি আঘাতের অভিযোগ নেই, তাছাড়া সে তার স্বামীকেও হারিয়েছে; তাকে জামিন দিলে মনে হয় না প্রসিকিউশন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরে আদালত মিন্নির জামিন বিষয়ে রায়ের জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার দিন ঠিক করে দেন।

Leave a Response