ফসলকে দোষারোপ নয় , মাটিকে ভারী ধাতু মুক্ত করা প্রয়োজন

সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদ মাধ্যমে কিছু কৃষি পন্যে ক্ষতিকারক ভারী ধাতু যেমন লেড , ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতির খবর পরিলক্ষিত হচ্ছে । মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক এইসব ধাতুর উপস্থিতি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটিতে বিশেষ করে শিল্প কারখানা সংলগ্ন কৃষি জমিতে লক্ষ্য করা গেছে । যার কারণে এই সমস্ত কৃষি জমিতে উৎপাদিত ফসলে ভারী ধাতুর উপস্থিতি আশংকা করা যায় ।

বিশেষজ্ঞদের মতে ক্যাডবিয়াম রাসয়নিক সার হতে এবং লেড ও ক্রোমিয়াম শিল্প কারখানার নির্গত বর্জ্য হতে মাটিতে আসে যা মাটিকে অতি মাত্রায় দূষণ করে । ফলে ঐ সমস্ত জমিতে উৎপাদিত ফসলাদিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে । যা ব্যবহারে মানব শরীরে বহুবিধ জটিল রোগের কারণ হতে পারে । তাছাড়া অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার পানিকে পুষিত করার ফলে সেচের মাধ্যমে জমিতে এই সমস্ত ক্ষতিকারক ভারী ধাতুর উৎপত্তি ঘটতে পারে । আমাদের দেশের কৃষকদের কৃষি জমিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা বা জ্ঞান না থাকায় জমিতে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

বিশেষজ্ঞদের মতে ,  ভারী ধাতুর কারণে কৃষি জমি দৃষিত হয় । ফলে উৎপাদিত খাদ্য সমূহের নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হয় ” । বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে কৃষিপণ্য রপ্তানি । বিগত ২০১৮ সালেই কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে । সিজারে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্যের বাজার ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে , এর মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ । যার অন্যতম কারণ হচ্ছে , প্রতিবছর অতি বৃষ্টির কারনে এদেশের অধিকাংশ কৃষি জমি বন্যাতে প্রাবিত হয় , ফলে নতুন পলিমাটি জমে কৃষি জমির মৌলিক ও ভৌতিক পরিবর্তন এবং জমির উর্বরতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় ও রোগ – বালাইয়ের প্রাদুর্ভাবও কম থাকে ।

ফলশ্রুতিতে দেশের জনগনের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে । কিন্তু ক্ষতিকর এইসব ভারী ধাতুর উপস্থিতি সংক্রান্ত প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের কারনে কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়ায় নেতীবাচক প্রভাব ফেলতে পারে । বর্তমানে বিশ্বের ১২০ টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে । এসব পণ্যের মধ্যে আছে – দুগ্ধজাত পণ্য , ডিম , মধু , ফুল , ভােজ্যতেল , বিভিন্ন ধরণের সবজি , মসলাজাতীয় ফসল ও খাদ্যশস্য , ফল , বাদাম , চা , তামাক , জ্যাম , জেলি , সস , স্যুপ , নুডলস ইত্যাদি । টেকসইযোগ্য কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি মূল কৌশল হচ্ছে আন্তজাতিক বাজারে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা এবং সেই সাথে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের যথাপোযুক্ত মূল্য অভ্যন্তরিন বাজারে নিশ্চিত করা ।

তাছাড়া উতপ্রযুক্তি ও প্রণোদনার মাধ্যমে চাষীদেরকে উচ্চমূল্যের ফসলের চাষাবাদে আকৃষ্ট করে কৃষি ভিত্তিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত রাখা । অতএব আভ্যন্তরিন ও আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে মাটির গুনাগুন ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে অগ্রাধিকার দিতে হবে । এক্ষেত্রে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউট কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে । সময় এসেছে ভারী ধাতুর উপস্থিতির মাত্রা কমিয়ে এনে কৃষি জমির মাটিকে দূষণমুক্ত রাখা এবং এই সমস্ত ভারী ধাতুর সম্ভাব্য উৎস খুজে বের করে জনগনকে সচেতন করা ।

সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি জনগন এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলােকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিষেশভাবে নজর রাখতে হবে । তাই ভ্রান্ত প্রচারে আতংকিত হয়ে ফসলকে দোষারােপ না করে অতিসত্তর সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ পূর্বক ভারী ধাতুর প্রভাব থেকে কৃষি জমির স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় এজেন্ডা “ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত রার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রনালয়গুলো সহ জনগন এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোকে সংগে নিয়ে সমন্বিত ও নিবীড়ভাবে বাস্তব সম্মত কর্মসূচির উদ্যোগ নিতে হবে ।

লেখক ,কৃষিবীদ মোঃ রেজওয়ানুল ইসলাম মুকুল,

সাবেক পরিচালক কৃষি তথ্য সার্ভিস

মোবাইল: ১৭১১১৯৬১১০

Leave a Response