‘পুলিশের ওপর হামলার পেছনে জামায়াত-শিবিরের হাত রয়েছে’

ঢাকা: একের পর এক পুলিশের ওপর হামলার পেছনে জামায়াত-শিবিরের হাত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

বলেছেন, রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও গত কয়েক মাসে বেশকিছু হামলা হয়েছে পুলিশের ওপর। এসব ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুলিশই হামলার মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে। আর এসব হামলার পেছনে রয়েছে জামায়াত-শিবিরের হাত। নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ও নব্য জেএমবি’র সঙ্গে এদের সংগঠনের অনেকেরই জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেককে গ্রেফতারের পর জানা গেছে, তারা শিবিরের সাবেক নেতা ছিলেন।

সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডিএমপির সিটিটিসি কার্যালয়ে পুলিশের ওপর সাম্প্রতিক হামলাগুলো নিয়ে আলাপকালে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। গত ৩১ আগস্ট রাজধানীর সায়েন্সল্যাবে হাতবোমা হামলার ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার বিষয়টি ফের আলোচনায় উঠে আসে। এ ঘটনার পরদিন হামলার দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস

পুলিশকেই কেন হামলার লক্ষ্য হচ্ছে, জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, পুলিশকে টার্গেট করার পেছনে নানা ধরনের কারণ রয়েছে। মূলত আগের ঘটনাগুলো সন্ত্রাসী হামলা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। যদিও জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক ঘটনা। তবুও বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ একটা জাতীয় প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আমরা অতীত নিকটে যদি দেখতে পাই, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিচার ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের উদ্ভব হয়। গণজাগরণ মঞ্চের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট প্ল্যাটফরম থেকে। তখন দেখা গেল, অনলাইন ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে দেশবাসীর বিরুদ্ধে দ্বার করিয়ে দিয়েছে। আমরা দেখতে পাই অনেক বছর পর আবার জঙ্গিবাদের উত্থান হয়। হত্যা শুরু করা হলো ব্লগারদের। এসব ঘটনায় কারা লাভবান হয়েছে? মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারাই বেনিফিশিয়ারি হয়েছে। এরা মূলত জামায়াত-শিবির।

মনিরুল আরও বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের বিলুপ্তির পরও জঙ্গি তৎপরতা অব্যাহত ছিল। এর ফলে আমরা হলি আর্টিজানে হামলার মতো ঘটনা দেখতে পাই। এ ঘটনায় আমরা দেখেছি শুধু সাবেক জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা জড়িত ছিল। এর আগে জেএমবি মূলত গঠনও করেছিল জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাই। জঙ্গি হামলার অনেক ঘটনায় আমরা যাদের গ্রেফতার করেছি, তাদের অনেকেও শিবিরের নেতাকর্মী।

২০১৬ সালের পরও যারা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছে, তাদের অনেকেই শিবিরের নেতা ছিলেন বলে জানান সিটিটিসি প্রধান। তিনি বলেন, এদের মধ্যে অনলাইন অ্যাকটিভিস্টই বেশি। তাদের মধ্যে শিবির ছাড়াও অনেক তরুণও যোগ দিয়েছে। পরে তাদের সাংগাঠনিক কাঠামো ভেঙে যাওয়ার কারণে অনলাইন প্রচারণাটা বেশি হয়েছে। এই অনলাইন প্রচারণার যে ভাষা, ছাত্রশিবিরের যে ভাষা, তাদের যে ‘বাঁশের কেল্লা’র ভাষা, এগুলোর সঙ্গে অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের ভাষার হুবহু মিল রয়েছে। এসব ভাষা কারা ব্যবহার করে, তা আমরা জানি। এখনো তারা একই রকম ভাষা ব্যবহার করে আসছে।

মনিরুল জানান, জঙ্গি হিসেবে গ্রেফতার হওয়া এমন অনেকেই আছেন যাদের নামে ছাত্রশিবিরের নেতা হিসেবে ১৫/১৬ টি মামলা রয়েছে। তারা জঙ্গি সংগঠনে নাম লিখিয়ে জঙ্গি হিসেবেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। এরকম কিছু ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাকে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের গ্রেফতারের প্রচেষ্টাটা রয়েছে।

ডিএমপির এই অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যখন শুরু হয়, তখন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল এরা। তখন তারা প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছে পুলিশকে। পুলিশও জানমাল রক্ষায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ঠেকাতে তাদের প্রতিহত করেছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থেই পুলিশ আইন প্রয়োগ করেছে, যেটা তাদের বিপক্ষে গেছে। ফলে সেই দিক থেকে পুলিশের ওপর তাদের প্রচণ্ড ক্ষোভ রয়েই গেছে।

পুলিশের একের পর এক অভিযানের কারণেই জঙ্গি সংগঠনগুলোতে যোগ দেওয়া জামায়াত-শিবিরের সাবেক নেতাকর্মীরা নতুন করে সংগঠিত হতে পারেননি বলে মনে করেন মনিরুল ইসলাম। আবার যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের গ্রেফতারেও পুলিশ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এসব কারণেই পুলিশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে বলে মত তার।

মনিরুল বলেন, আমরা বুঝতে পারছি, নব্য জেমবি নামে যারা কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাদের অধিকাংশই ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাকর্মী। ছাত্রশিবির থেকে পদত্যাগ করে তারা এসেছে, এমনটি নয়। বরং পুলিশের বিরুদ্ধে তাদের যে সাংগাঠনিক ক্ষোভ, সেটা মেটানোর জন্যই তারা পুলিশের ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

সিটিটিসি প্রধান বলেন, বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক অনেক জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, তাদের লিটারেচারেও বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টার্গেট করতে বলা হচ্ছে। ফলে এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তো রয়েছেই। তাছাড়া দেশীয় জঙ্গিবাদের প্রেক্ষাপটও রয়েছে।

দেশীয় প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে মনিরুল বলেন, ব্লগার হত্যাকাণ্ড যখন শুরু হয়, তখন পুলিশই সেসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে। গত কয়েক মাসের পাঁচটি ঘটনা ছাড়া বাকি সব ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে জঙ্গি সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা ধরা পড়েছে, কেউ বিভিন্ন অভিযানে মারা গেছেন, কেউ আত্মাহুতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এসব কারণেই তাদের সব ক্ষোভ পুলিশের ওপর এবং পুলিশকেই তারা টার্গেটে পরিণত করেছে।

Leave a Response